তারাতলার ধ্বংসস্তূপে এখনও চলছে জীবনের খোঁজ, মৃত ১১; স্বজনদের চোখে শুধু অপেক্ষা আর কান্না

কলকাতা: সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে তারাতলায়। একের পর এক কংক্রিটের চাঙড় সরানো হচ্ছে, লোহার বিম কেটে পথ তৈরি করছেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যখনই কাউকে বের করে আনা হচ্ছে, তখনই বুক কেঁপে উঠছে অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর। কারও মুখে প্রার্থনা, কারও চোখে অশ্রু, আবার কেউ নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন উদ্ধারকাজের দিকে।

বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানে আরও কয়েকজনের দেহ উদ্ধার হওয়ায় এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১। আহত অবস্থায় বহু শ্রমিক এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে, কারণ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কীভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা?

বুধবার দুপুরে তারাতলার একটি নির্মীয়মাণ গুদামে প্রতিদিনের মতোই কাজ চলছিল। শ্রমিকরা ছাদ ঢালাই ও অন্যান্য নির্মাণকাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ করেই বিকট শব্দে ভবনের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে কংক্রিট, লোহার রড এবং ভারী নির্মাণসামগ্রীর নিচে চাপা পড়ে যান বহু শ্রমিক।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কেউ কিছু বোঝার আগেই গোটা এলাকা ধুলোয় ঢেকে যায়। চারদিক থেকে ভেসে আসে আর্তনাদ। আশপাশের মানুষ প্রথমে নিজেরাই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

রাতভর লড়াই উদ্ধারকর্মীদের

এই উদ্ধার অভিযান মোটেই সহজ ছিল না। বিশাল আকারের কংক্রিটের স্ল্যাব ও লোহার বিম সরাতে ব্যবহার করা হয়েছে ক্রেন, গ্যাস কাটার এবং ভারী যন্ত্রপাতি। ধ্বংসস্তূপের নিচে কারও অস্তিত্ব আছে কি না, তা জানতে সেনাবাহিনীর গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার (GPR) প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে যাতে জীবিত কাউকে ক্ষতি না করে উদ্ধার করা যায়।

হাসপাতালের বাইরে অন্য এক যুদ্ধ

ঘটনাস্থলের মতোই আবেগঘন পরিবেশ দেখা যায় এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারের বাইরে। রাতভর সেখানে ভিড় করে ছিলেন নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা। কেউ বারবার চিকিৎসকদের কাছে খবর জানতে চাইছেন, কেউ ফোন হাতে অপেক্ষা করছেন কোনও পরিচিত মুখের সন্ধানের জন্য।

অনেক পরিবারের কাছে এখনও নিশ্চিত খবর পৌঁছায়নি। ফলে অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ আরও বাড়ছে। হাসপাতালে ভর্তি আহতদের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল কাজ করছে।

তদন্তে গতি, গ্রেফতার একাধিক

দুর্ঘটনার পরই প্রশাসন ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই গুদামের মালিক, কাঠামো নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী, শ্রমিক সরবরাহকারীসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ মনে করছে, নির্মাণে গাফিলতি বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে।

বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা নিয়ে

এই দুর্ঘটনার পর নতুন করে সামনে এসেছে নির্মাণস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ। শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছিল কি? নির্মাণের নকশা ও উপকরণের মান ঠিক ছিল কি? কাজের আগে সব ধরনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন উঠতে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় নির্মাণ প্রকল্পে সামান্য গাফিলতিও ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

রাজ্যজুড়ে শোকের ছায়া

তারাতলার এই ঘটনা শুধু কলকাতা নয়, গোটা রাজ্যকেই নাড়া দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষ শোক প্রকাশ করছেন। বহু সংগঠন নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

এখনও শেষ হয়নি অপেক্ষা

উদ্ধারকর্মীদের মতে, যতক্ষণ না ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি অংশ সরিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে আর কেউ আটকে নেই, ততক্ষণ অভিযান চলবে। সেই কারণেই ঘটনাস্থলে এখনও মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, দমকল, এনডিআরএফ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

তারাতলার বাতাসে এখন ধুলো কম, কিন্তু শোক অনেক বেশি। যে শ্রমিকরা সকালে রোজকার কাজ করতে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। কেউ ফিরেছেন আহত অবস্থায়, আর কেউ ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্নগুলোর হিসাব হয়তো কোনও সরকারি রিপোর্টে লেখা থাকবে না, কিন্তু এই দুর্ঘটনার যন্ত্রণা বহুদিন ধরে মনে রাখবে কলকাতা।

Leave a Comment